
সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং হতাশার কথা তুলে ধরে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। ২১ আগস্ট সকাল সোয়া ৯টায় তিনি এই লেখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ মেইল করেন এবং ফুটনোটে উল্লেখ করেন—
“জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।”
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ওইদিন সকাল ১০টার দিকে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি আর ফেরেননি। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ, এবং পরিবার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।
✍️ বিভুরঞ্জন সরকারের নিজের লেখা থেকে
“আমি বিভুরঞ্জন সরকার, আজকের পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি সময়ের। দেশের নানা পরিবর্তন, আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছি। এই দীর্ঘ সময় আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে। কিন্তু আজ, যখন নিজের জীবনকে দেখি, অনুভব করি—সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।”
🎓 ছাত্রজীবন ও সাংবাদিকতার সূচনা
স্কুল জীবনে থেকেই সাংবাদিকতায় যুক্ত হন, দৈনিক আজাদে তাঁর লেখা ছাপা হতো।
ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্পষ্টভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
📰 সাংবাদিকতার পথচলা
কর্মজীবনে কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, রূপালী, সাপ্তাহিক একতা, জনকণ্ঠসহ বহু পত্রিকায়।
সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র ও দৈনিক মাতৃভূমি।
সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ-এর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন।
তাঁর লেখা দীর্ঘদিন দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।
⚖️ সংগ্রাম ও ত্যাগ
এরশাদের আমলে নাম গোপন করে লেখার মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করেছেন।
সত্য প্রকাশের কারণে বহুবার চাকরি হারিয়েছেন, সম্মানী পাননি।
দীর্ঘদিন চাকরিহীন থেকে ঋণের বোঝা ও অসুস্থতা তাঁকে কাবু করেছে।
💔 ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতা
আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন।
মাসে ২০-২২ হাজার টাকার ওষুধ ব্যয় সামলাতে ধার-দেনায় ডুবে আছেন।
এক কন্যা ডাক্তার হলেও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় থিসিস পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
পুত্র বুয়েট থেকে পাশ করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি।
🌐 সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট
সরকারি চাপ ও মালিকানার ভয়ে সম্পাদকরা লেখালিখিতে স্বাধীন নন।
আজকের পত্রিকায় ৪ বছর কাজ করলেও পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি হয়নি।
নিজের লেখাকে আর পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে আগ্রহী নয় বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
🙏 কৃতজ্ঞতা ও আক্ষেপ
শফিক রেহমান, মতিউর রহমানসহ যাঁরা জীবনের পথে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
নিজের জীবনকে “কোনো সাফল্যের গল্প নয়, বরং অভাব-অভিযোগে ভরা” বলে উল্লেখ করেছেন।
শেষ লাইনে লিখেছেন:
“দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।”
🕯️ উপসংহার
বিভুরঞ্জন সরকারের এই খোলা চিঠি একদিকে যেমন একজন প্রবীণ সাংবাদিকের অসীম ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস, তেমনি বর্তমান সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও হতাশার প্রতিচ্ছবি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।