
২০২৪ সালে বাংলাদেশের জুলাই আগস্টে বিপ্লব ও গন অভ্যুত্থানের মহানায়কেরা ৩৬ জুলাই বিশ্ব অভিধানে সংযুক্ত করেছেন। ৩৬ জুলাই বলতে বিশ্বে এতদিন তেমন কিছুর অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। আন্দোলনটি যেহেতু জুলাই মাসে শুরু হয়েছে তাই বিপ্লবীদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য ৩১ জুলাইয়ের পর ১ আগস্ট কে ৩২ জুলাই ধারাবাহিকভাবে ৩৬ জুলাই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই গন অভ্যুত্থানের বিপ্লব নিশ্চিত হয়।
২০১৮ সালে কোটা তথা বৈষম্য বিরোধী তীব্র আন্দোলন তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সকল ধরনের কোটা বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে সমাপ্তি হয়। তৎপর্বর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ব্যাখ্যায় বলেছেন যে রাগ করে তিনি সকল কোটা বাতিল করেছেন। রাগ করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রধানমন্ত্রীর শপথ পরিপন্থী। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাওয়া না পাওয়া বিষয়ে সত্যাসত্য তথ্য প্রদান করে রাষ্ট্রপতি হওয়ার শপথ পরিপন্থী কাজ করেছেন। তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালে শপথ পরিপন্থী কাজ করে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন এবং গন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পালিয়ে শেষ রক্ষা হয়েছে। সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পতিত সরকারের আজ্ঞাবহ আর শপথ ভঙ্গ পরিপন্থী কাজ করার পরও ক্ষমতায় কতদিন থাকে সেটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দূরদর্শিতা এবং দক্ষতার উপর নির্ভর করছে। তাকে সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রপতি রাখা হয়েছে যদিও কোন রাষ্ট্রে গন অভ্যুত্থানের পর সংবিধান আর কার্যকর থাকেনা। উল্লেখ্য আজকের আলোচ্য বিষয় শপথ ভঙ্গ করা না করার পরিনতি বিষয়ক নয়।
৩৬ জুলাই বিপ্লবের সূচনা হয় কোটা সংস্কারের আন্দোলনের মাধ্যমে। হাইকোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে কোটা ফিরে আসার কারণে শিক্ষাঙ্গনে কোটা তথা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন জুলাই ২০২৪ আবার তীব্র হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, শুধু শিক্ষাঙ্গন নয় রক্তাক্ত হয় সারাদেশ এবং সহস্রাধিক জীবন নাশের ঘটনা ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর বক্তব্যে তখনকার পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। যে বক্তব্যটি আন্দোলন কে আরো বেগবান করেছে “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না, এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না, এই রক্তস্নাত কষাইখানা আমার দেশ না।”।
জুলাই ১৫, ২০২৪ গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত নারী পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের উপস্থিতিতে আওয়ামী অঙ্গ সংগঠনের দ্বারা অতর্কিত হামলা করে শিক্ষাঙ্গন রক্তাক্ত করা হয়েছে। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপরও হামলা করা হয়েছে যেটি এধরনের হামলার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট মামলার শুনানির ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। হাইকোর্ট কোটার সংস্কার করে সরকারকে ৯৩% মেধাবীদের মধ্যে এবং ৭% কোটাধারীদের নিয়োগ এবং প্রয়োজনে সরকার কোটার অনুপাত কম বেশি করতে পারবে এমন রায় দেয়।
২৪ জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বুধবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কোটা বিরোধী তথা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫২ সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতিতে ৯ দফা দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘দেশে কোটা তথা বৈষম্য সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ককে গুম করে ফেলা হয়েছে। অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের বাবা ছেলেকে ফিরে পেতে হাসপাতালের মর্গে পর্যন্ত ঘুরতে হচ্ছে। জানালার পাশে পড়ার সময় কোমলমতি শিশু সামিরকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, শুধুমাত্র আদালতের রায় ও প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে সরকার দেশব্যাপী চালানো গণহত্যার দায় এড়াতে পারে না। আমাদের ৯ দফা দাবি এখন গণমানুষের দাবিতে পরিণত হয়ছে। এটি এখন গোটা বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সনদ’।
দেশে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদের পাঠানো বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ৯ দফা দাবি আদায়ে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ২৯ জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে সোমবার ডিবি কার্যালয়ে পুলিশের এবং কয়েকজন সমন্বয়কের উপস্থিতিতে একজন সমন্বয়ক কে লিখিত বিবৃতি পাঠ করে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে দেখা গেলেও আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে ৩০ জুলাই ২০২৪ মঙ্গলবার বাংলাদেশে এক দিনের যে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়, তা প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন কর্মসূচি পালন করে।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে একজন সমন্বয়ক মো: মাহিন সরকার বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় শোককে প্রত্যাখান করে আগামীকাল লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তুলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি করার জন্য অনুরোধ করছি।’অনলাইনেও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীদের বিশাল বিজয় হয়। এবিজয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
Student movement floods social media with red profile pictures; July 30, 2024; Dhaka Tribune
Bangladeshi Facebook users flood newsfeeds with red; July 30, 2024; The Daily Star
‘লাল’ প্রোফাইলে সয়লাব ফেসবুক; জুলাই ৩০, ২০২৪ জাগো নিউজ ২৪.কম
সরকার তড়িঘড়ি করে ১ আগস্ট বা ৩২ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ (১) ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। অন্যদিকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন মঞ্চ থেকে সর্বশেষ ৩৪ জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ১ দফা দাবি করা হয়। আন্দোলনটির নেতৃত্ব দেন বেশ কজন সমন্বয়ক তবে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন নাহিদ ইসলাম।আন্দোলনকারীদের প্রতি আস্থা রেখে তাদের দাবির সাথে একের পর এক একাত্মতা ঘোষণা করেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এমনকি দেশের সর্বস্তরের জনতা। এদিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা জীবন নাশের হুমকি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি তার নিজ কার্যালয় থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেন। এই অনন্য সাহসী পদক্ষেপ আন্দোলনকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেয়।
জামায়াত-শিবির ৩৪ জুলাই ২০২৪ অসহযোগ আন্দোলন এবং শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ১ দফা দাবিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজপথে অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মত যোগদান করলে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং প্রায় ৭২ ঘন্টার মধ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রজ্ঞাপন জারি করা স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগেরই পতন নিশ্চিত হয়। শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩৫০ সাংসদসহ, মন্ত্রী, দলীয় নেতাকর্মীদের দেশ ছাড়া বা গা ঢাকা দেওয়ার ইতিহাস তৈরি হয়। যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বৈষম্য বিরোধী জুলাই আন্দোলন পরবর্তীতে ছাত্র জনতার উত্থান তথা ছাত্র জনতার বিজয় হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।
৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিজয় নিশ্চিত হলেও এ বিজয়কে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন মঞ্চ থেকে চুড়ান্ত বিজয় নয় বরং প্রাথমিক বিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ এই আন্দোলনের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য মুক্ত এক বাংলাদেশ গঠন করা যেটি কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।
অবশেষে ৮ আগস্ট ২০২৪ পশ্চিমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারসহ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী পশ্চিমাদের ঘনিষ্ঠজন বিশ্ব নন্দিত প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। এই অন্তবর্তীকালীন সরকারে অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম যিনি উপদেষ্টা পদত্যাগ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এবং বর্তমান এনসিপি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক। অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ যার লাশ তার বাবা মর্গে মর্গে খুঁজছিলেন তিনিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।
৩৬ জুলাই বিপ্লবের অন্তবর্তীকালীন সরকার একটি জন আকাঙ্ক্ষার সরকার ফলে এই জন আকাঙ্ক্ষার সরকারের নিকট জনপ্রত্যাশার পরিমানও অধিক। জুলাই আন্দোলন শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারি চাকরিতে কোটায় নিয়োগের মাধ্যমে যে বৈষম্য তৈরি হয় তার বিরুদ্ধে নয় বরং সমাজের সর্বস্তরে বিরাজমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে। কোটা, ঘুষ, দলীয়করণ, দূর্নীতি এবং অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী, স্বামী পরিত্যক্তা, দূস্থ ইত্যাদির ন্যায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও মাসিক ভাতা দিয়ে অসম্মান করতঃ আর্থিকভাবে বৈষম্যমূলক সমাজ গঠন করা ইত্যাদি সকল ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। যে ভাতা মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করা সেটি বাতিল করাও জনপ্রত্যাশার অংশ।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধাদের মাসিক ভাতা দেওয়ার কারণেই দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০০০ হাজার যেটি সামাজিক মাধ্যমে চাউর হয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির বিষয়ে অক্টোবর ৯, ২০২১ তারিখের প্রথম আলো সংবাদ শিরোনাম করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের ৯ বছর পর জন্ম নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা!’ অবৈধভাবে গৃহীত রাষ্ট্রীয় যেকোনো সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরৎ আনয়নসহ অপরাধীদের দ্রুত রাষ্ট্রদ্রোহী আইনে বিচার করতে হবে।
মাত্র অল্প কদিনেই প্রায় ১৫ বছরে দেশের শিরা উপশিরায় প্রবেশ করা একটি সরকারের পতন ঘটানোর অব্যহতি পরই সারাদেশ যে স্প্রিটে অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফিতে ছেয়ে ফেলা হলো, সারাদেশে ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো ফলে জনগণের মনে আরো আশার সঞ্চার হয় যে দ্রুতই একই স্প্রিটে বিগত সরকারের আমলের দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের মাধ্যমে নিয়োগকৃতদের বরখাস্ত, গ্রেফতার বা বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ৯৫% মুসলিমদের দেশে একটি ইসলামী সংবিধান রচনার মাধ্যমে নতুন ইসলামী রাষ্ট্র পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেই জন আকাঙ্ক্ষার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া, আকাঙ্ক্ষার সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবায়ন বা বিপ্লব তথা গন অভ্যুত্থানের স্প্রিট যেন নিভু নিভু জ্বলছে। কেননা এখন পর্যন্ত পূর্বের সরকারের নিয়োগকৃতদের নিয়োগ বাতিল, নতুন গন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য গ্রেফতার বা বিভিন্ন প্রক্রিয়া জাতির সামনে বিপ্লবের স্প্রীটে উপস্থিত করতে পারেনি বর্তমান ৩৬ জুলাই বিপ্লবের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর পূর্বের সরকারের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রপতি তো বহাল তবিয়তেই আছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমের স্থবিরতা জন আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী যে বিষয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যম সংবাদ শিরোনাম করেছে তন্মধ্যে প্রণিধানযোগ্য: Civil admin runs slow as top tier still jittery; October 1, 2024; The Daily Star
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে এনজিও বা চট্টগ্রামের লোকের প্রাধান্য থাকায় কেউ কেউ আবার কটাক্ষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা বিভিন্ন উপায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বুঝাতে এনজিও পরিষদ বা চট্টগ্রাম জেলা সমিতি বলেছেন। যদি এনজিও পরিষদ বা চট্টগ্রাম জেলা সমিতির কারনে বিপ্লবী সরকারের কার্যক্রম ধীরগতির হয় তাহলে উপদেষ্টাদের মধ্যে রদবদল করা যেতে পারে জন আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে। কারণ এটি কোন স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা নয় যে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা করা যাবেনা। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত উপদেষ্টাকে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রনালয়ে বদলী করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার যাই বলিনা কেন এধরনের সরকার সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণীর পেশার মানুষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে এনজিও পেশাদারদের আধিক্য থাকলেও সর্বশেষ ১০ নভেম্বর ২০২৪ উপদেষ্টা বহরে আরো কয়েকজন নতুন মুখ যোগ হওয়ার পরও দেশের গুরুত্বপূর্ণ এবং চতুর্থ স্তম্ভ খ্যাত গনমাধ্যমের কোন প্রতিনিধিত্বের জায়গা হয়নি। যে গনমাধ্যম মানবাধিকার, সুশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদিকে সঠিকভাবে চলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, অতীতে সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি। গত ১৫ বছরে ও তার আগের সরকার সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে বিগত সরকার সংবাদপত্রকে শত্রু হিসেবে দেখেছে। (তথ্যসূত্র: ডিসেম্বর ১০, ২০২৪; প্রথম আলো) গনমাধ্যমকে শত্রু মনে করলে পতিত সরকারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সুতরাং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জনপ্রত্যাশা পূরনের জন্য গনমাধ্যমের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টরের প্রতিনিধিত্বের দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ অচিরেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সৃষ্টি করতে হবে।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ বলে একটি প্রবাদ আছে। যেটি দ্বারা কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তার পরবর্তী কার্যক্রম কিভাবে পরিচালনা করবে তা তার প্রাথমিক কিছু কার্যক্রমের মাধ্যমে বোঝা যায় বা বোঝানো হয়। অন্যদিকে কিছু বিষয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পূর্বের সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে বলে জাতি মনে করছে। তারমধ্যে পতিত সরকারের সুবিধাপুষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তিকে উপদেষ্টা নিয়োগ, ৩ কোটি টাকার ব্যাংক চেকের মাধ্যমে ডিসি নিয়োগ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতি, লাগামহীন দূর্নীতি, চাঁদাবাজি , হত্যা, রাহাজানি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যে কারণে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যারাকের বাইরে অবস্থান অন্যতম। যদি বর্তমান সরকার জনগণকে দেখানো প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করে তাহলে ধরে নিতে হবে জাতিকে একধরনের আশা দেখিয়ে ভিন্ন ধরনের স্বার্থ হাসিল করাই ছিল এই আন্দোলন বা সরকারের কাজ যেটি জাতির সাথে প্রচ্ছন্ন বেইমানি। গন অভ্যুত্থানের নিভু নিভু আলো বুমেরাং হতে পারে কেননা বিপ্লব বা গন অভ্যুত্থান যাই বলি না কেন প্রতিবিপ্লব বা পাল্টা গন অভ্যুত্থানও পৃথিবীর রাজনীতিতে বিরাজমান। অন্যদিকে জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সুতরাং জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি: প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরো বেশ কিছু বিষয়কে আমলে নিয়ে কাজ করা জরুরি:
১. গন অভ্যুত্থানের স্প্রিট যেন ম্লান না হয়।
২. সম্প্রতি বিগত সরকারের গৃহিত সকল কার্যক্রম গন আদেশের মাধ্যমে বাতিল করা।
৩. প্রত্যেকটি সেক্টর ধরে ধরে পূর্বের সরকারের অনৈতিক কাজে সমর্থন দিয়েছে, সুবিধা গ্রহণ করেছে রাষ্ট্রপতিসহ এমন সব অংশীজন, কর্মকর্তা কর্মচারী অপসারণ করত: গৃহিত সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়া এবং দ্রুত শাস্তি প্রদান।
৪. শুধু ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ার কারণে নিয়োগসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিতদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
৫. গন অভ্যুত্থানের পর পর সারাদেশ অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফিতে ছয়লাব এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মধ্যে যে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন।
৬. ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত থাকবে এটি বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের মাধ্যমে বুঝাতে হবে। যেমন আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালইয়াদীন’ এবং ‘লা ইকরাহা ফিদদীন’ অর্থ যথাক্রমে ‘তোমাদের কর্মফল তোমাদের জন্য আর আমার কর্মফল আমার জন্য’ এবং ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নেই’
৭. বৈষম্য বিরোধী এবং কোটা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমেই আজকের রাষ্ট্র। সুতরাং কোটা এবং অন্যান্যভাবে রাষ্ট্রে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে সেটি শূন্যে নিয়ে আসা।
৮. গন অভ্যুত্থানের অব্যহতি পরই জনগণের আকাঙ্ক্ষার অন্যতম বিষয়গুলো আলোচনায় চলে আসছে তারমধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তন কেননা বর্তমান জাতীয় সঙ্গীত এদেশের প্রতিনিধিত্ব করেনা। জনগণের আকাঙ্ক্ষার সরকারকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করতে হবে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার অবমূল্যায়নের ফলেই এদেশে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লব ও গন অভ্যুত্থান হয়েছে সেটি সর্বদা স্বরনীয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভক্তির পর পরই আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েই মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যেন ইসলাম বিরোধী বিপ্লবের কর্মসূচি হিসেবে মুসলিম বা ইসলাম শব্দ মুছতে থাকে তারমধ্যে অন্যতম পাকিস্তান সরকার কর্তৃক স্থাপিত জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় যার বর্তমান নাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ইত্যাদি থেকে মুসলিম শব্দটি মুছে দেওয়াসহ আল্লামা ইকবাল হলের নাম জহুরুল হক হল নামকরণ। পরবর্তীতে হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে দুটি হল তাদের পূর্বের নাম ফিরে পেলেও আল্লামা ইকবাল হল এবং জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে প্রকৃত নামে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। যদিও বিষয়টি ২০২৪ সালের বিপ্লব ও গন অভ্যুত্থানের স্প্রিটের অন্তর্ভুক্ত।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বা রাস্তায় ভাষ্কর্যের নামে যে মূর্তি তৈরি করে জনগণের অর্থের অপচয় করা হয়েছে সেটিও এদেশের ৯৫ ভাগ মুসলিমরা মেনে নিতে পারে না কেননা এটি ইসলামী রীতি পরিপন্থী। অথচ সেই অর্থ দিয়ে কলকারখানা স্থাপন করলে এদেশ থেকে বেকারত্বের মতো অভিশাপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। জুলাই গন অভ্যুত্থানের স্প্রিটের মাধ্যমে এই মূর্তিগুলো এখন নিশ্চিহ্ন করা সময়ের দাবি।
যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বার বার আন্দোলন হয়েছে, রক্ত ঝরেছে, সহস্রজাধিক জীবন নাশ হয়েছে, রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সেই বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এমন নিয়োগ, সনদপত্র ও চলমান সুযোগ সুবিধা বাতিল করতঃ গৃহিত সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা, বৈষম্য সৃষ্টির পিছনে জড়িতদের শাস্তি প্রদানের নিশ্চয়তা, জনবল সংকট নিরসনে বিশেষ নিয়োগ বিধির মাধ্যমে বয়সের ফ্রেমে না আটকে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, দ্রব্যমূল্য ও দূর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে গনমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করা ইত্যাদি জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা একই সরলরেখায় আনয়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাস্তবায়ন করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
+8801782524223
alhelaljudu@gmail.com