
দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মামলা, হামলা, কারাবাস ও নির্যাতনের মধ্যেও বিএনপির পতাকা আগলে রাখা মাগুরা–২ আসনের ত্যাগী তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার কথা প্রকাশ করেছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা কাজী সালিমুল হক কামাল। দলের হাই কমান্ডের একতরফা সিদ্ধান্তে তৃণমূলের আবেগ ও দীর্ঘদিনের ত্যাগের কোনো মূল্যায়ন না হওয়ার বেদনা জানিয়ে তিনি আসন্ন কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।
ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া এক দীর্ঘ আবেগঘন বক্তব্যে কাজী সালিমুল হক কামাল এসব কথা বলেন।

বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালের পর থেকে তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। তবে ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় তাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ প্রায় সাত বছরের কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীরে ২২ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির দিন নেতাকর্মীদের ভালোবাসা, আবেগ ও চোখের পানি তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয় বলে জানান তিনি।
মুক্তির পর দীর্ঘদিন মাগুরায় না এলেও পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর, আড়পাড়া, সিংড়া ও শত্রুজিৎপুরে আয়োজিত সংবর্ধনায় অংশ নেন তিনি। গত ১৬ মাসে এই চারবার মাগুরা সফরে এসে তিনি নেতাকর্মীদের চোখে শুধু ভালোবাসাই নয়, বরং ১৬ বছরের জমে থাকা কষ্ট ও বেদনার প্রতিচ্ছবি দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।
কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, গত ১৬ বছর ধরে ত্যাগী নেতাকর্মীরাই মামলা, হামলা, জেল ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে মাগুরার মাটিতে বিএনপির পতাকাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। অথচ আজ তাদের আবেগ ও মতামতের কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাগুরা–২ আসনে দলের প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর তৃণমূলের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা হঠাৎ নয় বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুইজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে আপত্তি জানালেও দলের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, ত্যাগী ও পরীক্ষিত ছাত্রদল-যুবদল থেকে উঠে আসা নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের চেষ্টা দলের আদর্শিক ভিতকে দুর্বল করতে পারে। অনেক নেতাকর্মীর আশঙ্কা, বর্তমান মনোনয়ন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভোটব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং দলের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, “তৃণমূলই দলের প্রাণ। হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীকে উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে দল শক্তিশালী হয় না, বরং ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়।” এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তার দায়ভার কে নেবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পরিশেষে কাজী সালিমুল হক কামাল জানান, দীর্ঘ সাত বছরের কারাবাসে তার পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের একান্ত অনুরোধেই তিনি আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জীবনের বাকি সময় পরিবারকে নিয়ে শান্তিতে কাটাতে চান বলেও জানান তিনি।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আবেগ ও ক্ষোভ থাকলেও এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন না নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কর্মীদের চোখের পানি কখনো দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।
সূত্র: কাজী সালিমুল হক কামালের ফেসবুক ওয়াল