মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার গোয়ালদহ বালুঘাটে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সুপারিশে অনুমোদন পাওয়া এক গ্রামীণ মেলায় র্যাফেল ড্র’র নামে কয়েক লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে বিপুল পরিমাণ লটারি টিকিট বিক্রি করা হলেও, পুরস্কার না দিয়েই আয়োজকদের পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতারিত সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে মেলার প্যান্ডেলে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দ্বারিয়াপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম প্রদীপ মাগুরা জেলা প্রশাসকের কাছে এক মাসব্যাপী গ্রামীণ মেলা, সার্কাস, যাত্রাপালা ও র্যাফেল ড্র আয়োজনের অনুমতি চান। সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর সুপারিশের ভিত্তিতে ২০ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য মেলার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে আয়োজকরা ২২ মার্চ থেকে কার্যক্রম শুরু করে এবং নির্ধারিত সময় অতিক্রম করে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত মেলা চালিয়ে যান।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-১

আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান মেলায় কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম না চালানোর নির্দেশ দিলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গ্রামীণ মেলা, সার্কাস ও যাত্রাপালার আড়ালে প্রতিদিন রাতে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শক টানা হয়।
একই সঙ্গে মোটরসাইকেলসহ অন্তত ৫০টি আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে ২০ টাকা মূল্যের লটারি টিকিট বিক্রি করা হয়, যা মাগুরার চার উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব লটারির মাধ্যমে আয়োজকরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও প্রশাসন ছিল অনেকটাই নীরব।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল রাতে র্যাফেল ড্র’র মাধ্যমে ৫০ জন বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হলেও কোনো পুরস্কার বিতরণ করা হয়নি। প্রথম পুরস্কার হিসেবে ঘোষিত ১৫০ সিসি পালসার মোটরসাইকেলসহ মূল্যবান পুরস্কারগুলোও দেওয়া হয়নি। পরদিন ৭ এপ্রিল আরও কয়েক লাখ টাকার টিকিট বিক্রি করা হলেও রাতে ড্র না করেই আয়োজকরা গা-ঢাকা দেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয়রা মেলার প্যান্ডেলে ভাঙচুর চালায়। লটারির টিকিট বিক্রির সময় বিভিন্ন স্থানে আয়োজকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
লটারিতে মোটরসাইকেল বিজয়ী রবিউল ইসলাম অন্তরসহ অনেকেই পুরস্কার বুঝে পেতে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম প্রদীপ বলেন, তিনি শুধু মেলার অনুমতির জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল বিশ্বাসের ভাই ইদ্রিস আলি ও বিএনপি কর্মী মোমিন মেলার আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করেছেন। থানা থেকে হঠাৎ মেলা বন্ধের নির্দেশ আসায় তারা পুরস্কার না দিয়েই পালিয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহমেদ বলেন, “লটারি হলো জুয়ার মূল উৎস। আমাদের দলের কোনো ব্যক্তি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে, সে যে পর্যায়েরই হোক না কেন, আইন তাকে খুঁজে বের করবে। আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাই, অবৈধ এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দল কখনোই কারো ব্যক্তিগত অবৈধ কাজের দায় নেবে না।”
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “৩ এপ্রিল পর্যন্ত মেলার অনুমোদন ছিল এবং র্যাফেল ড্র’র সীমিত অনুমতি ছিল। এরপর মেলা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চালানো হয়েছে। একজন ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এদিকে মাগুরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শ্বাশতী শীল বলেন, নির্ধারিত সময়ের পর মেলা চালানো হয়েছে কিনা তা প্রশাসনের জানা নেই। তবে কোনো ধরনের প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রতারিতরা দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার, তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।