“আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করুন—আপনি সত্যিই একজন সাংবাদিক, নাকি রাজনীতিবিদ?”
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের উদ্দেশে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে—গণমাধ্যম বলতে আসলে কাকে বোঝাচ্ছি? সাংবাদিকতা কি শুধু অবস্থান নির্ধারণের জায়গা হয়ে গেছে?”
বুধবার (৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (সিরডাপ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনা সভা।
বিষয়: ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামোর পর্যালোচনা’
সভা সঞ্চালনা করেন সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।
🔶 আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন:
বিশেষ অতিথি ছিলেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। আরও উপস্থিত ছিলেন
পারভেজ করিম আব্বাসী (সিজিএস),
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী (গণফোরাম),
অধ্যাপক শামীম রেজা (ঢাবি),
রেজওয়ানুল হক রাজা (মাছরাঙা টিভি),
রিয়াজ আহমেদ (ঢাকা ট্রিবিউন),
ডা. মওদুদ হোসেন পাভেল (বিএনপি মিডিয়া সেল),
আসিফ বিন আলী (জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি),
মাহবুব মোর্শেদ (বাসস),
মাহমুদা হাবীবা,
সোনিয়া জামান খান,
কাজী জেসিন,
মনজুরুল ইসলাম,
জাহিদ নেওয়াজ খান,
ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান প্রমুখ।
______________
🔷 আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য:
🔸 মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “প্রফেসর ইউনুসের নেতৃত্বে সরকার মিডিয়া সংস্কারে বড় কিছু করবে এমন প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন আমরা দেখিনি। সুপারিশ দিয়ে গেলে কাজ হবে না—বাস্তবায়ন চাই।”
🔸 পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, “বর্ষা বিপ্লবের পর মিডিয়া আগের চেয়ে স্বাধীন হয়েছে—পুরোপুরি না হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। তবে হ্যারাসমেন্ট ও ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।”
🔸 রিয়াজ আহমেদ মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এখন কার্যত অস্তিত্বহীন। যে কারণে আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহার বেড়েছে।”
🔸 অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, “সেলফ রেগুলেশনের নামে সাংবাদিকদের উপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও নিরাপত্তার বিষয় এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না।”
🔸 রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, “প্রেস কাউন্সিল বিলুপ্ত করে প্রেস কমিশন গঠনের সুপারিশ দেওয়া হলেও সেটিকে পাশ কাটিয়ে পুরনো কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে।”
🔸 ডা. মওদুদ হোসেন পাভেল বলেন, “কর্পোরেট গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন অনেক মিডিয়া হাউজ সংবাদ নয়, বরং তাদের স্বার্থরক্ষার কাজ করছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
🔸 আসিফ বিন আলী বলেন, “মিডিয়া এখন রাজনৈতিক অর্থনীতির কৌশলে পরিচালিত হয়। সরকারে কে আছে, আর কে নেই—এতে কিছু যায় আসে না।”
🔸 মাহবুব মোর্শেদ বলেন, “ওয়েজ বোর্ড নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি—এটা আসলে সাংবাদিকদের স্বার্থ থেকে মনোযোগ সরানোর একটা অপচেষ্টা। কমিশনের রিপোর্ট অনেকটাই কর্পোরেটমুখী।”
🔸 মাহমুদা হাবীবা বলেন, “সাংবাদিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মূল্যায়ন করা জরুরি। সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।”
🔸 ড. সোনিয়া জামান বলেন, “তথ্য অধিকার আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রায়শই তা বাধাগ্রস্ত হয়। আইনি ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া সাংবাদিক সুরক্ষা সম্ভব নয়।”
🔸 কাজী জেসিন বলেন, “সরকার চাইলে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সাংবাদিকদের কাছ থেকে অভিযোগ সংগ্রহ করতে পারত।”
🔸 মনজুরুল ইসলাম বলেন, “গণমাধ্যমের উপর নতুন চাপ এসেছে—কে নিজের লোক আর কে নয়, এই বিভাজনের রাজনীতি মিডিয়ার পেশাদারিত্ব ধ্বংস করছে।”
🔸 ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, “প্রেস কাউন্সিলের দায়িত্ব সীমিত হলেও তার ভূমিকা কার্যকর করতে হবে। আইনি কাঠামো থাকলেও প্রয়োগ নেই।”
______________
📌 উপসংহার:
আলোচকগণ একমত হন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল সুপারিশ নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন জরুরি। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত না করে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।